পৌরনীতি

দুর্নীতি (Corruption) কি? দুর্নীতির ধারণা, কারণ, নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধের উপায়।

দুর্নীতি কি? (What is Corruption in Bengali?)

দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধি এবং এক ধরনের সামাজিক অপরাধ। বিশ্বের প্রতিটি দেশই কম-বেশি এ সমস্যায় আক্রান্ত। দুর্নীতি স্মরণাতীতকাল থেকে সমাজে ছিল। দুর্নীতির করালগ্রাস সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এক মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। উপেন্দ্র ঠাকুর ‘Corruption in Ancient India’ গ্রন্থে দুর্নীতি প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা পছন্দ করি আর না করি, দুর্নীতি ছিল, আছে এবং থাকবে।” তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে দুর্নীতির কৌশল, পদ্ধতি এবং ধরনে নানা রকম পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশে এ সমস্যা আরও ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।

দুর্নীতির ধারণা (Concept of corruption)

দুর্নীতির সংজ্ঞা নির্ধারণ বেশ কঠিন। ব্যক্তি বা কোনো গোষ্ঠীর অবৈধ পন্থায় নীতি বহির্ভূত বা জনস্বার্থ বিরোধী কাজই হলো দুর্নীতি। দুর্নীতি সমাজে প্রচলিত নীতি, আদর্শ, আইন ও মূল্যবোধ পরিপন্থী এক ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। সাধারণভাবে দুর্নীতি বলতে আইন ও নীতিবিরুদ্ধ কাজকেই বুঝায়। দুর্নীতির সাথে পেশা, ক্ষমতা, সুযোগ-সুবিধা, পদবি, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান ইত্যাদি বিষয় গভীরভাবে জড়িত।

সমাজবিজ্ঞানী জে.এম. লাঙ্গ বলেন, “দুর্নীতি এমন এক ধরনের আচরণ যা ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য কোন দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিকে যথাযথ কর্ম সম্পাদন থেকে বিরত রাখে।”

সমাজবিজ্ঞানী রামনাথ শর্মার মতে, “অবৈধ সুযোগ-সুবিধা লাভের জন্য কোনো ব্যক্তির দায়িত্ব পালনে স্বেচ্ছাকৃত অবহেলাই দুর্নীতি।” (“In corruption a person will fully neglected his specified duty in order to have an under advantage.”)। সমাজকর্ম অভিধান- এর ব্যাখ্যানুযায়ী, রাজনৈতিক ও সরকারি প্রশাসনে দুর্নীতি বলতে বোঝায় অফিস আদালতকে ব্যক্তিগত লাভের জন্য ব্যবহার করা।

Oxford Advanced Learners Dictionary- তে বলা হয়, “অর্থ প্রাপ্তি বা কোনো অবৈধ সুযোগ প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে অসৎ বা অসঙ্গতি কাজে ইচ্ছাকৃতভাবে নিজ ক্ষমতা ব্যবহার করাকে দুর্নীতি বলা হয়।” (Willingly to use their power to do dishonest or illegal things in return money or get an advantage.)

সাধারণত ঘুষ, শক্তি প্রয়োগ বা হুমকি প্রদান, প্রভাব খাটিয়ে ব্যক্তি বিশেষকে বিশেষ সুবিধা প্রদান, গণ-প্রশাসনের ক্ষমতার অপব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা লাভকে দুর্নীতি বলা হয়। স্ব-স্ব পেশার মাধ্যমে অবৈধ স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে কৃত অপরাধমূলক আচরণই দুর্নীতি।

দুর্নীতির কারণ (Causes of Corruption)

বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে দুর্নীতি একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। সমাজে মানুষ কখন, কোন পরিস্থিতিতে দুর্নীতি করে থাকে তা নির্ণয় করা বেশ কঠিন। বিভিন্ন কারণে বর্তমানে দুর্নীতির প্রকৃতি ও পরিধি যেমন বিচিত্র তেমনি এর কারণও বহুমুখী রূপ লাভ করেছে। নিম্নে দুর্নীতির কারণসমূহ উল্লেখ করা হলো :

১। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা : আর্থিক অসচ্ছলতায় টানাপোড়নের জীবন থেকে পরিত্রাণ লাভ করার দুর্নিবার ইচ্ছা ও সচ্ছলভাবে জীবনযাপনের প্রবল আকাঙ্ক্ষার কারণে অনেকে দুর্নীতি করে থাকে।

২। সামাজিক প্রভাব ও মর্যাদা বৃদ্ধির ইচ্ছা : রাতারাতি সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষাও আমাদের দেশের মানুষকে দুর্নীতিবাজ হতে প্ররোচিত করে। টাকা থাকলে সমাজে সম্মান বাড়ে, প্রভাব বৃদ্ধি হয়, মানুষ সম্পদশালী ব্যক্তির গুণ কীর্তন করে— এ ধারণা বাস্তবায়নের জন্য আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাও দুর্নীতির মাধ্যমে অধিক সম্পদের মালিক হওয়ার জন্য সচেষ্ট হয়।

৩। উচ্চাভিলাষী জীবনের মোহ : উচ্চাভিলাষী জীবনের দুর্নিবার মোহে আমাদের সমাজের মানুষ নিজ নিজ পেশা ও বৃত্তির মধ্য দিয়ে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করতে চায়। আর্থিক অনটন শুধু নয়, অধিক সম্পদশালী হওয়ার নেশাও মানুষকে দুর্নীতিবাজ করে তোলে।

৪। অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা : সামাজিক মর্যাদা লাভের অসম অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সমাজে দুর্নীতি বিস্তারে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সৎপথে অর্জিত অর্থের মাধ্যমে এরূপ প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয় বলে অনেকে দুর্নীতির পথ বেছে নেয়।

৫। বেকারত্ব : সমাজে বেকার সমস্যা দুর্নীতি সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। কেউ ঘুষ দিয়ে চাকরি পেলে স্বাভাবিকভাবে সে ঘুষ লেনদেনের সাথে জড়িয়ে পড়তে পারে।

৬। রাজনৈতিক অস্থিরতা : আমাদের দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সংকীর্ণ দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি দুর্নীতি বিস্তারের জন্য বিশেষভাবে দায়ী। রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় পরিচয়ের সুযোগ নিয়ে অনেকে প্রভাব খাটিয়ে ব্যাপকহারে দুর্নীতি করে থাকে।

৭। পারিবারিক চাপ ও দায়বদ্ধতা : আমাদের সমাজে উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে নিজ পরিবারের দায়িত্ব বহন করতে হয়। তাই পরিবারের পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্ত্রী, সন্তানাদির প্রতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে দুর্নীতির পথে পা বাড়ায়।

৮। অসৎ কর্মচারী-কর্মকর্তাদের সহায়তা : আমাদের দেশে এক শ্রেণির অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতি করতে মানুষকে নানাভাবে সহযোগিতা করে নিজেরাও আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করে।

৯। আইনের ফাঁকফোকর : দুর্নীতি দমনে প্রচলিত আইনের অস্পষ্টতা বা ফাঁকফোকরের সুযোগ নিয়ে দুর্নীতিবাজরা রেহাই পেয়ে যায়। জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের বেলায় এরূপ দুর্নীতি বেশি লক্ষ করা যায়।

১০। যথাযথ আইন প্রয়োগের অভাব : যথাযথ আইন বা আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে দুর্নীতি রোধ সম্ভব হয় না। দুর্নীতি বিরোধী আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে বাংলাদেশে দুর্নীতি ক্রমশ বাড়ছে।

১১। দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধের অভাব : দেশ ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, ভালোবাসা মানুষকে সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখে। এ বোধকে বলা হয় মানবিক মূল্যবোধ । দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধের অভাব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে সেই সাথে দুর্নীতিও বাড়ছে।

দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ বা প্রতিরোধের উপায় (Means of prevention and controls of Corruption)

দুর্নীতি একটি সর্বগ্রাসী সামাজিক ব্যাধি। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে আসীন ব্যক্তিবর্গ থেকে নিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও দুর্নীতির সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশনের পাশাপাশি দুর্নীতি দমনে যথাযথ আইন প্রণয়নসহ জনগণকে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। নিম্নে দুর্নীতি প্রতিরোধের বিভিন্ন উপায় সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

১। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা : আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কড়াকড়িভাবে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ দুর্নীতি প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়। দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত কেউ যাতে শাস্তি এড়াতে না পারে, সেজন্য সংশ্লিষ্ট আইনের কঠোর প্রয়োগ দুর্নীতি হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

২। আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্যহীনতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ : অনেক সরকারি চাকরিজীবীর জীবনযাত্রার ধরন, মাসিক ব্যয় তার আয়ের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। অনেকে চাকরি করে গাড়ি ও বাড়িসহ বিত্তশালী হয়ে ওঠেন। আয়ের সাথে ব্যয়ের এ সামঞ্জস্যহীনতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে দুর্নীতির প্রবণতাকে হ্রাস করতে পারে।

৩। সরকারি অডিট-ইন্সপেকশনে কড়াকড়ি : সরকারি অডিট ও ইন্সপেকশন নিয়মিত এবং কড়াকড়িভাবে করা প্রয়োজন। এ ব্যবস্থা সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি থেকে অনেকটা বিরত রাখতে সহায়তা করবে।

৪। সরকারি নিরীক্ষণ কমিটি গঠন : রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের বাজেটের ওপর আইনগত নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে না পারলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না। বাজেট নিয়ন্ত্রণ দুর্নীতির অন্যতম রক্ষাকবচ।

৫। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা : স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রতিষ্ঠা দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে পারে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে বিচার বিভাগকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে দিতে হবে।

৬। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের দায়িত্বশীলতা : বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল বিশ্বে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে বেশিরভাগ বড় দুর্নীতি সংগঠিত হয়। তাই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এক্ষেত্রে দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও দেশপ্রেমিকের ভূমিকা পালন করতে হবে।

৭। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বশীলতা : সরকারি-বেসরকারি সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সততার সাথে তাদের দায়িত্ব পালনে তৎপর থাকতে হবে। কর্মচারীদের যথাযথ দায়িত্ব পালন দুর্নীতির মাত্রা অনেকটা হ্রাস করতে পারে।

৮। নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি : দুর্নীতিমুক্ত একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য জনগণের নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এ জন্য সরকারি ও রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের নিয়মিত তদারকি, প্রয়োজনীয় প্রচার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতাসহ অবাধ তথ্য প্রবাহ দুর্নীতি মোকাবেলায় কৌশল হিসেবে কাজ করতে পারে।

৯। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা : অধিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের বেকার যুবকদের কর্মক্ষম করে তোলার মাধ্যমে দুর্নীতি অনেকটা হ্রাস হতে পারে।

১০। বেতন-ভাতা নির্ধারণে সমানুপাতিক হার : সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতাদি দ্রব্যমূল্যের সমানুপাতিক হারে নির্ধারণ করতে হবে।

১১। দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি : বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার আইনগত অধিকার প্রদান করতে হবে।

১২। দুর্নীতিবাজদের সামাজিকভাবে বর্জন করা : দুর্নীতিবাজ মানুষদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সেই সাথে সামাজিকভাবে তাদের এড়িয়ে চলা ও ঘৃণা প্রদর্শনের মাধ্যমে করতে হবে সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত। সমাজে বসবাসরত সকলকে দুর্নীতির বিভিন্ন ধরন ও চিহ্নিত দুর্নীতিবাজদের সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। সকল প্রকার সামাজিকতায় তাদেরকে সর্বাগ্রে বর্জন করতে হবে।

১৩। নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক চেতনা সৃষ্টি : মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত করা এবং নৈতিক শিক্ষার প্রসার দুর্নীতি রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সন্তানের নৈতিক চরিত্র গঠনে পিতামাতাকে সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে দুর্নীতি ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকার মানসিকতা ছোটবেলা থেকে গড়ে ওঠে।

এ সম্পর্কিত বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তরঃ–

১। দুর্নীতি কি?

ক) শারীরিক ব্যাধি

খ) উপার্জনের উপায়

গ) সামাজিক অধিকার

ঘ) সামাজিক ব্যাধি

সঠিক উত্তর : ঘ

২। নিচের কোনটি দুর্নীতির কারণ?

ক) প্রতিবন্ধিতা

খ) খাদ্যে ভেজাল

গ) নাগরিক অসচেতনতা

ঘ) রাজনৈতিক অস্থিরতা

সঠিক উত্তর : গ

৩। দুর্নীতি একটি সর্বগ্রাসী–

ক) শারীরিক ব্যাধি

খ) মানসিক ব্যাধি

গ) সামাজিক ব্যাধি

ঘ) চিন্তামূলক ব্যাধি

সঠিক উত্তর : গ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button