কম্পিউটারের ইতিহাস- The History of Computer Part 06

Posted on

কম্পিউটার গেম

নােলান কে বুশনেলের নাম কম্পিউটার গেমে উদ্ভাবনের সঙ্গে জড়িত। ১৯৭১-৭২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নাটিং এসােসিয়েটস’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রােডাক্ট ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। সেখানে কাজ করার সময় তিনি কম্পিউটার স্পেস’ নামে একটি গেম উদ্ভাবন করেন। এর ব্যবসায়িক সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে তিনি চাকরি ছেড়ে দিলেন। প্রতিষ্ঠা করেন “সিজগি’ নামে একটি কোম্পানি। পরে সেটির নাম হয় ‘আটারি। চীনে একটি খেলা আছে, যেটির নাম গাে। এই খেলার সময় আটারি উচ্চারণ করে প্রতিপক্ষকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। সেই গেম থেকে এই নামটি নেওয়া হয়েছে। এরপর ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তার হােম সংস্করণ বের করা হয় ? আটারির পদাংক অনুসরণ করে আরাে বহু প্রতিষ্ঠান গেমের জগতে এসেছে। তার মধ্যে এমিগা, নিনটেন্ডাে, কিংবা সাম্প্রতিককালের সনির নাম উল্লেখযােগ্য। এর ব্যবসায়িক সম্ভাবনা বেশি বলেই মাইক্রোসফটের মতাে কোম্পানি গেমের দিকেও মনােনিবেশ করেছে। উইন্ডােজ সফটওয়ার দ্রুত বড় কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। গেম খেলার জন্য এক সময় পৃথক কম্পিউটার লাগতাে। পিসিতে ছােটখাট গেমই খেলা যেতাে। গেমের চাহিদা ছিল গতির, গ্রাফিক্সের। গেমের প্রস্তুতকারকরা সে সময় পিসিকে নির্ভরযােগ্য মনে করেন নি। পিসির ক্ষমতা সত্যিকার অর্থেই বেড়ে যাওয়ার পর এখন পিসি ভিত্তিক গেমের অভাব নেই। 

প্রতিটি গেমের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য থাকে। এই বৈশিষ্ট্যগুলাে অবশ্য নির্ভর করে গেমের প্রকৃতির উপর। কোনাে কোনাে গেম প্রতিবারে নতুন অবস্থায় খেলা হয়। আবার কিছু কিছু গেম প্রতিটি অবস্থায় বৈচিত্র্যময়। বেশির ভাগ গেমে থাকে একাধিক লেভেল। এক লেভেল অতিক্রম করেই অন্য লেভেলে যাওয়া যায়। র্থিাৎ ক্রমান্বয়ে সহজ লেভেল থেকে জটিল লেভেলে যেতে হয়। তবে প্রতিবার খেলার সময় প্রথম লেভেল থেকে শুরু করতে হবে এমন কথা। মাঝখানে কোনাে লেভেলে গিয়ে খেলা শেষ করতে চাইতে চাইলে সেভ করা যায়। তখন সেই লেভেলে এসে পুনরায় খেলা শুরু করা যায়। অনেক গেম আবার ব্যবহারকারীকে তার দক্ষতার ভিত্তিতে খেলার সুযােগ দেয়। যেমন : ফিফা গেমটিতে এমেচার, প্রফেশনাল, ওয়ার্ল্ড ক্লাস ইত্যাদি আছে। এতে সহজ থেকে কঠিন গেম খেলা যায়। দক্ষতা বাড়লে গেমার ধীরে ধীরে উচ্চ স্তরে যেতে পারেন। আসলে দুর্বল গেমারের কথাও ভাবা হয়েছে। অনেক একশন গেমে গেমার যে চরিত্র নিয়ে খেলেন, সেটার একাধিক লাইফ থাকে। ফলে দুয়েক বার মারা গেলেও বা পরাজিত হলেও খেলা চালিয়ে যাওয়া যায়। অস্ত্রেরও বৈচিত্র্য আছে। একেক লেভেলে এক এক ধরনের অস্ত্র পাওয়া যায় । এ সমস্ত গেমকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা হয় সেগুলাের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। যেমন : বল গেম, একশন গেম, স্ট্রাটেজি গেম ইত্যাদি। বল গেমের কথাই ধরা যাক। পিসিতে প্যারানয়েড় অন্তত একবার খেলেন নি এরকম লােক কমই আছে। বিভিন্ন ধরনের প্রচলিত বল গেমের অনুকরণ ছাড়াও বিভিন্ন স্ট্র্যাটেজির উপর নির্ভর করে গেম বানানাে হয়েছে। ডি এক্স বল, পিন বল এ ধরনের গেম। কিছু আছে একশন গেম। কয়েকটি একশন গেম হচ্ছে কোয়েক, টুম্ব রেইডার, ডিউক নিউকেম, এনএফএস ইত্যাদি। পাজল গেম আরেক ধরনের গেম। এর মধ্যে ট্রিভিয়াল পারসুইট, বাকু বাকু ইত্যাদির নাম উল্লেখ করা যায়। বিভিন্ন কার্ড গেমও এ ধরনের গেম। স্পেস কমব্যাট গেম আরেক ধরনের গেম । সায়েন্স ফিকশন বা বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর আবেদন এখনকার প্রজন্মের কাছে অপরিসীম। স্পেস শাটল ব্যবহার করে এবং লেজার জাতীয় অস্ত্র নিয়ে ভিন গ্রহের শত্রুর সাথে যুদ্ধ করতে কে না চান!  স্টার ওয়ার্স নামে জনপ্রিয় সিনেমার উপর ভিত্তি করে একাধিক গেম নির্মিত হয়েছে । এটির নির্মাতা লুকাস আর্টস। এতে সিনেমার চরিত্রগুলােও আছে। এর ঘটনাগুলাে ঘটে ভবিষ্যতে। যখন এক গ্রহ থেকে আরেক গ্রহে যাতায়াত কোনাে ব্যাপার নয়। যুদ্ধ হয় গ্রহ দখল করার জন্য।

ভিলেন ক্ষমতা চায় ইউনিভার্সের প্রভু হতে। স্টার ওয়ার্স দি ফ্যান্টম মিনেস এরকম গেমের একটি। ওই গেমে আছে ১১টি লেভেল বা স্তর। প্রতিটি লেভেলে ভিন্ন ভিন্ন শত্রুর সাথে খেলতে হয়, বা যুদ্ধ করতে হয়। কোনাে লেভেলে কাউকে উদ্ধার করা বা কোনাে লেভেলে স্পেসশিপে ওঠা, কোনাে লেভেলে কাউকে খুঁজে বের করাই উদ্দেশ্য । তাদের সাথে শুধু যুদ্ধ নয়, কথাও বলা যায়। এটিকে একশন গেমও বলা যায় । থ্রি ডি এফেক্ট থাকাতে গেমটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। গ্রাফিক্স অত্যন্ত উচ্চমানের । ফলে গেমটি বর্তমানে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এইভােজ সফটওয়ারের তৈরি একটি অ্যাডভেঞ্চার গেমের নাম টুম্ব রেইডার। এর মূল চরিত্র বা নায়িকা লারা ক্রফট। সে এক কথায় অসাধারণ। লারা ক্রফটকে চেনে  এমন গেমার পৃথিবীতে বােধ হয় কমই আছে। জনপ্রিয়তায় এটি অত্যন্ত এগিয়ে এর মধ্যে। এর তিনটি সংস্করণ বেরিয়েছে। ভবিষ্যতে আরাে বেরােবে। লারা ক্রফট বিভিন্ন স্থানে অভিযানে বেরােয়। এ অভিযানে সে যে সমস্ত প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়, তা নিয়েই এ গেম। অভিযানটি ঘটে একেক সময় একেক জায়গায়। অভিযানে সে ক্রমান্বয়ে ভয়ানক অবস্থার মধ্যে পড়তে থাকে। কোথাও আছে গ্যাংস্টার বা মাস্তান বাহিনী। কোথাও ভয়ংকর উপজাতি। আবার কোথাও আছে ভয়ানক জানােয়ার । তাই বিভিন্ন স্তরে এসব প্রতিকূলতার মধ্যে জয়লাভের নেশায় গেমার ভিন্ন জগতে হারিয়ে যায় । গেম শেষ হয় কোনাে একটি বস্তুকে পাওয়ার মধ্যে দিয়ে। গাড়ি ছােট বড় সকলকেই আকর্ষণ করে। এটা গতির স্মারক। নিড ফর স্পিড একটি রেসিং গেম।

এটি ইলেক্ট্রনিক আর্টসের তৈরি। এতে যে গ্যারাজ আছে, তাতে আছে পৃথিবীর নামী দামি এবং বিলাসবহুল সব গাড়ির মড়েল । বিএমডব্লিউ হােক বা হােক ফেরারি- গেমার স্বচ্ছন্দে এর যে কোনাে একটি বেছে নিতে পারেন। তবে প্রথমেই নয়। এজন্যে অপেক্ষা করতে হয়। গেমের শুরুতে তাকে দেওয়া হয় সামান্য কিছু অর্থ । সে অর্থ দিয়ে খুব ভালাে গাড়ি কোনাে যায় না। যাই হােক, বেছে নেয়ার পর শুরু হয় সেগুলাে নিয়ে দৌড়। দৌড়ের জিততে পারলে গেমার পান বিশাল সৰ প্রাইজ মানি। সে টাকা দিয়ে আরাে ভালাে গাড়ি কেনা যায়। ওই গেমে আছে হট পারস্যুট। হলিউডে এই থিমের উপর ভিত্তি করে অনেক বিখ্যাত সিনেমা তৈরি হয়েছে, নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে। হট পার স্যুটের সময় পুলিশ গেমারকে ধাওয়া করে। পুলিশকে ধাপ্পা দেওয়া সহজ কথা নয়। কারণ, পুলিশ প্রয়ােজনবােধে হেলিকপ্টার ব্যাক আপ নিতে পারে। এমনিতর নানা কঠিন অবস্থাতে জিতে আসার মধ্যেই গেমের পরম আনন্দ অনুভব করা যায়। প্রিন্স নামে একটি গেম বহুদিন ধরে পিসিতে গেমারদের আনন্দ দিয়েছে। এর নায়ক পারস্যের এক রাজকুমার। তার ভিলেন হচ্ছে জাফর। ভিলেন রাজকুমারীকে অপহরণ করলে রাজকুমার তাকে উদ্ধার করতে ব্ৰতী হয়। এ কাজ করতে গিয়ে তাকে নানা বিপদসংকুল অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়। তার উদ্দেশ্য সাধন করতে হলে এ সব প্রতিকূলতাকে জয় করতে হবে। 

ডেথট্রাপ ডানজন এইডােজ’ সফটওয়ারের আর একটি এডভেঞ্চার গেম। এর গল্প হচ্ছে এক রাজাকে নিয়ে। রাজা তার উত্তরাধিকার দিয়ে যাবেন যােগ্য উত্তরসূরী কাছে। যােগ্য উত্তরসূরীকে এজন্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। তিনি পরীক্ষার জন্য তৈরি করেন একটি দুর্গ। এতে বহু ধরনের ভয়ংকর অবস্থা তৈরি করা যায় । যে এর মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে পারবে, যে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে। এতে দুটি চরিত্র আছে। একটি নারী ও অপরটি পুরুষ। গেমার এর যে কোনােটি নিয়ে খেলতে পারেন। বিভিন্ন লেভেলে গেমার ভিন্ন ভিন্ন ধরনের অস্ত্র পান। এমন কি গেমার যাদু করার অস্ত্রও পান। বিভিন্ন স্তরে এগুলাে পাওয়া যায় এবং পরে সেগুলাে ব্যবহার করা যায়। একটি স্ট্র্যাটেজী গেম হচ্ছে ‘এজ অব এমপায়ার’। এটি মাইক্রোসফটের তৈরি। খেলার পটভূমি সভ্যতার শুরুতে। একটি জাতির প্রতিষ্ঠা ও ইতিহাস রচনাই তার উদ্দেশ্য। গেমারকে একেক বার একেক কৌশল অবলম্বন করতে হবে। তার শত্রু হচ্ছে অন্য জাতি। তারাও বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে জয় লাভের জন্য । গেমারকে নিজের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তার উদ্দেশ্য হচ্ছে অন্য জাতির চাইতে বড় হওয়া। কম্পিউটার গেম কি ভালাে না মন্দ! এ প্রশ্ন অনেক অভিভাবককে পীড়িত করে । সমাজতত্ত্ববিদ ও মনস্তত্ত্ববিদগণ এ নিয়ে গবেষণাও করছেন। এক সময় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যে বাচ্চাদের ঘরে ধরে রাখার জন্য বাবা-মারা তাদের ভিডিও গেম কিনে দিচ্ছেন। তাদের ভয়, বাইরের জগতে বেশি ক্ষণ থাকলে তারা খারাপ সংসর্গে পড়ে যাবে। আবার দিনে সে সব তরুণ-কিশােররা ঘন্টার পর ঘন্টা ভিডিও গেম নিয়ে মেতে থাকে, তাদের পড়াশােনার মনােসংযােগ নষ্ট হয়। অনেকে পড়াশােনার চাইতে গেমের পেছনেই সময় নষ্ট করে বেশি। আবার কোনাে কোনাে গেম তাদের মানসিক বিকাশকেও ব্যাহত করে। বিশেষ করে ভয়ানক বা মারমুখী গেমগুলাে তাদের আচরণকেও পরিবর্তিত করাতে পারে। গেম খেললে কম্পিউটারে দক্ষতা বাড়বে এ কথাও অনেকে বলেন। যদি অন্যান্য প্রােগ্রাম আয়ত্ত না করে, শুধু গেমের পেছনে সময় বেশি ব্যয় করা হয়, তাহলে গেম খেলে কম্পিউটারের দক্ষতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা বােধ করি আদৌ নেই, এ কথাটিও সত্য বটে।

কম্পিউটার ভাইরাস

ভালাে-মন্দ আমাদের জীবনের অঙ্গ, তেমনি কম্পিউটার সফটওয়্যারের ভালাে দিকের বিপরীতে আছে ভাইরাস ভাইরাস পরজীবী । প্রাণীদেহে প্রবেশ করার পর বংশবৃদ্ধি করে এবং ক্ষতি করে। কম্পিউটার ভাইরাস এক ধরনের শক্তিশালী সফটওয়ার । কখনাে তা প্রোগ্রাম ফাইলকে আক্রমণ করে। কখনাে করে সাধারণ ডকুমেন্ট ফাইলকে। কখনাে কখনাে কম্পিউটারটিকে অচল করে দিতে পারে। আবার কখনাে যা করে তা রসিকতার পর্যায়ে পড়ে বা বড় জোর বিরক্তিকর। সন্দেহ নেই, ভাইরাস যে কোনাে কম্পিউটার ব্যবহারকারীর জন্যে আতংকের সৃষ্টি করে থাকে । ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে জন জন ভন নিউম্যান বলেছিলেন কম্পিউটারের প্রােগ্রামের পক্ষে বংশবৃদ্ধি করা সম্ভব। এ ধারণার উপর ভিত্তি করে পঞ্চাশের দশকে বেল ল্যাবরেটরিতে কর্মরত প্রোগ্রামাররা কোর’ নামে একটি গেম তৈরি করেছিলেন। এই প্রােগ্রাম অন্যের কম্পিউটারে গিয়ে আক্রমণ করতে পারত। আক্রমণ করে ডাটা নষ্ট করতাে। ফ্রেড কোহেন নামে বিদ্যুৎ প্রকৌশলের এক ছাত্র ‘ভাইরাস’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ট্রোজান হর্স বের হয়। তার কয়েক বছরের মাথায় ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এখন তা ভাইরাস তাে প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে। আগে ভাইরাস ফ্লপি বা বহনযােগ্য মাধ্যমে ছড়াতাে। এখন ইন্টারনেটের ব্যবহারের ফলে অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে এগুলাে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে। গঠন বা আক্রমণের প্রকৃতি অনুসারে ভাইরাসের কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন : বুট ভাইরাস’, ‘প্রােগ্রাম ভাইরাস’, ‘পলিমফিক ভাইরাস, ম্যাক্রো ভাইরাস’ প্রভৃতি ধরণের ভাইরাস। 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *