আর্টিকেল

উপন্যাস (Novel) কাকে বলে? উপন্যাসের উদ্ভব, শ্রেণিবিভাগ এবং বৈশিষ্ট্য।

উপন্যাস কাকে বলে? (What is called a Novel?)

উপন্যাস বলতে বোঝায় বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞার ভিত্তিতে একটি জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক আখ্যানকে। আবার বলা যায়, যে আখ্যান ধর্মী সাহিত্য মানুষের অভিজ্ঞতা লব্ধ সামগ্রিক জীবন কাহিনী, চরিত্র, মানব, জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত মনস্তাত্বিক বিশ্লেষণে সমৃদ্ধ হয়ে ও লেখকের জীবনাদর্শ ও জীবনের বোধ, দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয় তাকে উপন্যাস বলে।

উপন্যাসের উদ্ভব

গল্প শোনার আগ্রহ মানুষের সুপ্রাচীন। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মানুষের এই আগ্রহের ফলেই কাহিনির উদ্ভব। তখন প্রাকৃতিক শক্তির প্রতীক হিসেবে মুখে মুখে প্রচলিত গল্প-কাহিনির বিষয় হয়ে ওঠে দেব-দেবী, পুরোহিত, গোষ্ঠীপতি ও রাজাদের কীর্তিকা। লিপির উদ্বাবন ব্যবহার ও মুদ্রণ যন্ত্রের আবিষ্কার হতে বহু শতক পেরিয়ে যায়। ততদিনে মানবসমাজে সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় সম্রাট, পুরোহিত ও ভূস্বামীদের। ফলে দেবতা ও রাজ-রাজড়ার কাহিনিই লিপিবদ্ধ হতে থাকে ছন্দ ও অলংকারমতি ভাষায়। এভাবেই ক্রমে কাব্য, মহাকাব্য ও নাটকের সৃষ্টি।

‘দৈনন্দিন জীবনযাপনের ভাষায় তথা গদ্যে কাহিনি লেখার উদ্ভব ঘটে ইতিহাসের এক বিশেষ পর্বে। মুখে মুখে রচিত, কাহিনি যেমন রূপকথা, উপকথা, পূরাণ, জাতকের গল্প ইত্যাদি পরে গদ্যে লিপিবদ্ধ হলেও মানুষ এবং মানুষের জীবন ওইসব কাহিনির প্রধান বিষয় হতে পারেনি। কারণ তখনো সমাজে ব্যক্তি মানুষের অধিকার স্বীকৃত হয়নি, গড়ে ওঠেনি, তার ব্যক্তিত্ব; ফলে কাহিনিতে ব্যক্তির প্রাধান্য লাভের উপায়ও ছিল অসম্ভব। ইউরোপে যখন বাণিজ্য পুঁজির বিকাশ শুরু হয় তখন ধীরে ধীরে মধ্যযুগীয় চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণার অবসান ঘটতে থাকে। খ্রিস্টীয় চৌদ্দো-ষোলো শতকে ইউরোপীয় নবজাগরণ বা রেনেসাঁসের ফলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা, বিজ্ঞান ও যুক্তিনির্ভরতা, ইহজাগতিকতা এবং মানবতাবাদ। ক্রমে যা হয়ে ওঠে শিক্ষিত সামজের সচেতন জীবনযাপনের অঙ্গ। রেনেসাঁসের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করে সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠিত হলে বিজ্ঞান ও দর্শনের অগ্রগতি বাধাহীন হয়ে ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় বাণিজ্য পুঁজির বিকাশ আরম্ভ হলে সমাজে বণিক শ্রেণির গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় এবং রাজা, সামন্ত-ভূস্বামী এবং পুরোহিতদের সামাজিক গুরুত্ব হ্রাস পেতে থাকে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ভাগ্যনির্ভরতা পরিহার করে মানুষ হয়ে ওঠে স্বাবলম্বী, অধিকার-সচেতন এবং আত্মা প্রতিষ্ঠায় উন্মুখ। এভাবে ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব, রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ এবং আমেরিকার স্বাধীনতা অর্জনের ঘটনা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্র চর্চার পথ, খুলে দেয়। সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিমানুষ এবং ব্যক্তির জীবনই হয়ে ওঠে সাহিত্যের প্রধান বিষয়। এভাবেই ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সমাজ পরিবর্তনের পটভূমিকাতেই উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে উপন্যাসের।

অবশ্য এর পূর্ববর্তী কয়েক শতকেও পৃথিবীর নানা দেশে রচিত হয়েছে বিভিন্ন কাহিনিগ্রন্থ, যাতে ব্যক্তির জীবন, তার অভিজ্ঞতা, তার সুখ-দুঃখ, অনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ, তার আশা-হতাশা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে গভীর বিশ্বস্ততার সঙ্গে? এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো- ‘আলিফ লায়লা ওয়া লায়লানে’, ‘ডেকামেরন’, ‘ডন কুইকজোট’ ইত্যাদি।

উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে উনিশ শতক খুবই তাৎপর্যবহ। এ সময়ে লেখা হয়েছে পৃথিবীর বেশ কিছু শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। যেমন-ফ্রান্সের স্তাঁদালের ‘স্কারলেট এ্যান্ড ব্ল্যাক’, এমিল জোলার ‘দি জারমিনাল’, ব্রিটেনের হেনরি ফিল্ডিং-এর ‘টম জোনস’, চার্লস ডিকেন্সের ‘এ টেল অফ টু সিটিজ’, রাশিয়ার লিও তলন্তয়ের ‘ওয়ার এ্যান্ড পিস’, ফিয়োদর দস্তয়ভস্কির ‘ক্রাইম এ্যান্ড পানিশমেন্ট’ ইত্যাদি। উপন্যাস শিল্পকে বিকাশের শীর্ষ স্তরে পৌছে দেয়া এসব মহৎ উপন্যাসে পাঠকের মনকে যুক্ত করে বৃহত্তর জগৎ ও জীবনের সঙ্গে।

উপন্যাসের শ্রেণিবিভাগ (Classification of Novel)

উপন্যাস বিভিন্ন প্রকারের হতে পারে। কখনও তা কাহিনি-নির্ভর, কখনও চরিত্র-নির্ভর; কখনও মনস্তাত্ত্বিক, কখনও বক্তব্যধর্মী। বিষয়, চরিত্র, প্রবণতা এবং গঠনগত সৌকর্যের ভিত্তিতে উপন্যাসকে নানা শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন–

১। সামাজিক উপন্যাস

সামাজিক উপন্যাস (social novel) উপন্যাসের একটি বিশেষ শ্রেণী। এই শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে উনিশ শতকে। এই শতকে ইংরেজি সামাজিক উপন্যাসগুলিতে সমাজের নানা অন্যায়-অবিচার, কুপ্রথা প্রভৃতির উদ্‌ঘাটন এবং তাদের সমালোচনার মাধ্যমে সমাজ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করা হয়। ইংল্যান্ডের ভিক্টোরিয়ান যুগের মহিলা ঔপন্যাসিক এলিজাবেথ ক্লেগহর্ন গ্যাসকেল সমাজ সংস্কারের আদর্শ নিয়ে উপন্যাস রচনায় ব্রতী হয়েছিলেন। তিনি তার মেরি বার্টন (১৮৪৮) ও নর্থ অ্যান্ড সাউথ (১৮৫৫) উপন্যাস দু’টিতে শিল্পবিপ্লবোত্তর ইংল্যান্ডের শ্রমিকসমাজের দুঃখ-দুর্গতি, পুঁজিপতিদের শোষণ, বেকারি ও অনাহার, প্রতিকূল অবস্থার চাপে নারীর গণিকাবৃত্তি গ্রহণ ইত্যাদি নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। পাদ্রি চার্লস কিংসলের (১৮১৯-৭১) উপন্যাসেও সমাজ সংস্কারের প্রেরণা ছিল অত্যন্ত প্রবল। তার অ্যালটন লক জনৈক চার্চিস্ট শ্রমিকের কাল্পনিক আত্মজীবনী। এই উপন্যাসে লন্ডন শহরের কোনো কোনো অঞ্চলের পঙ্কিল পরিবেশ ও শ্রমিকদের শ্রেণীসচেতনতার কথা বাস্তব ও তীব্রভাবে ফুটে উঠেছে। শেষপর্যন্ত অবশ্য কিংসলে শ্রেণীসংগ্রাম নয়, খ্রিস্টধর্মে নায়কের বিশ্বাসকেই চিত্রিত করেছেন।

চার্লস ডিকেন্সের প্রায় প্রতিটি উপন্যাসেই সমাজের অন্যায়-অত্যাচার সজীব কল্পনায় চিত্রিত হয়েছে। তার নিজের শৈশব অত্যন্ত দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে অতীবাহিত হয়েছিল। ডিকেন্স তার অলিভার টুইস্ট (১৮৩৮) উপন্যাসে অনাথ আশ্রমে শিশুদের শোচনীয় দুর্গতির কথা, নিকোলাস নিকোলবি (১৮৩৮-৩৯) উপন্যাসে শিক্ষার নামে উৎপীড়ন ও শোষণ, ব্লেক হাউজ (১৮৫২-৫৩) উপন্যাসে আইনব্যবস্থার জটিলতা ও শ্লথগতি এবং তার সুযোগ নিয়ে উকিলদের অসহায় মক্কেলদের নির্মম শোষণ ও বঞ্চনা, লিটল ডোরিট (১৮৫৫-৫৬) উপন্যাসে সরকারি আমলাতন্ত্রের নির্মম হৃদয়হীনতা ও অবিচার ইত্যাদি চিত্রিত করেছেন। এই সব উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে দরিদ্রদের প্রতি লেখকের গভীর সহানুভূতি ব্যক্ত হয়েছে।

বাংলা ভাষায় সামাজিক উপন্যাস ধারার সার্থক রূপকার হলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তার সামাজিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে অরক্ষণীয়া, বামুনের মেয়ে ও পল্লীসমাজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অরক্ষণীয়া (১৯১৬) উপন্যাসে একটি শাস্ত্রনির্দিষ্ট বয়সে কন্যার বিবাহ দিতে না পারায় কন্যা ও মাতার সামাজিক লাঞ্ছনা ও দুর্গতি এবং বামুনের মেয়ে (১৯২০) উপন্যাসে কৌলিন্যপ্রথার বিষময় ফল, উক্ত প্রথার অসঙ্গতিপূর্ণ ও অন্তঃসারশূন্য গর্ব এবং অসহায় মেয়েদের উপর সমাজপতিদের অত্যাচারের বাস্তবসম্মত চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। শরৎচন্দ্রের সামাজিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে পল্লীসমাজ সর্বশ্রেষ্ঠ। শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এই উপন্যাসটি সম্পর্কে বলেছেন,

পল্লীসমাজ-এ আচারনিষ্ঠা ও সমাজরক্ষার অজুহাতে যে কতটা ক্রূরতা, নীচ স্বার্থপরতা ও হেয় কাপুরুষতা আমাদের সমর্থন লাভ করিয়াছে, আমাদের জীবন যে কি পরিমাণ পঙ্গু ও অক্ষম হইয়া পড়িতেছে — ইহাই তিনি চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দিয়াছেন।

২। ঐতিহাসিক উপন্যাস

জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঐতিহাসিক ঘটনা বা চরিত্রের আশ্রয়ে যখন কোনো উপন্যাস রচিত হয় তখন তাকে ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে। ঐতিহাসিক উপন্যাসে লেখক নতুন নতুন ঘটনা বা চরিত্র সৃজন করে কাহিনিতে গতিময়তা ও প্রাণসঞ্চার করতে পারেন কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য থেকে বিচ্যুত হতে পারে না। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘রাজসিংহ’, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ধর্মপাল’, মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’, সত্যেন সেনের ‘অভিশপ্ত নগরী’, ঐতিহাসিক উপন্যাস বলে বিবেচিত। রূশ ভাষায় লিখিত তলস্তয়ের কালজয়ী গ্রন্থ ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’, ভ্যাসিলি ইয়ানের ‘চেঙ্গিস খান’ বিখ্যাত ঐতিহাসিক উপন্যাস।

উপন্যাসের বৈশিষ্ট্য (Characteristics of Novel)

  • আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্য সকল সাহিত্য শাখার মতো উপন্যাসের নির্দিষ্ট কোনো শিল্পরূপ নেই।
  • উপন্যাস আধুনিক জীবনের গদ্যকাব্য যা বাস্তব জীবনের প্রতিফলন।
  • উপন্যাসের মধ্য দিয়ে জীবন সম্পর্কে লেখকের একটা নিজস্ব ব্যাখ্যা প্রকাশিত হয়।
  • উপন্যাস সাহিত্য সরকার একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো একটি বিশিষ্ট জীবন দর্শনের প্রকাশ ঘটানো হয়।
  • উপন্যাসের সমকালের জীবন দর্শন প্রকাশিত হয়।
  • উপন্যাসের সমকাল জীবন দর্শনের সঙ্গে সামরিক জীবন দর্শণ ও প্রকাশিত হয়।
  • মানুষের জীবনের গল্প শোনার আগ্রহ থেকে উপন্যাসের সৃষ্টি হয়েছে, উপন্যাসে গল্পের আবহ থাকে।
  • উপন্যাসে সাধারণত কোনো তত্ত্ব বা আদর্শ প্রচারিত হয় না যদিও কখনো উপন্যাসে কোন তত্ত্ব বা আদর্শ প্রচারিত হয় তবে উপন্যাসের নিজস্ব শিল্পগুণ নষ্ট হয়।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button